প্রজ্ঞাজ্যোতি বড়ুয়া নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান প্রতিনিধি :
দুর্গম পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ, আর মেঘ-ছোঁয়া জনপদ নাইক্ষ্যংছড়ি। সেই নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়ি সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাচীন বোধি বৃক্ষ। যুগ যুগ ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃক্ষকে ঘিরে হঠাৎ জেগে উঠেছে এক "সত্যি"র গল্প। আর সেই গল্পের টানেই আজ হাজারো মানুষ ছুটছে পাহাড় পেরিয়ে শুধু দেখতে নয়, ছুঁয়ে দেখতে, প্রার্থনা করতে, মানত করতে।
স্থানীয়দের বিশ্বাস, সম্প্রতি এই বোধি বৃক্ষের মাঝে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পেয়েছে। কেউ বলছেন সত্যের ছটা দেখেছেন, কেউ বলছেন মনের কামনা পূর্ণ হয়েছে। মুখে মুখে, ফোনে ফোনে সেই খবর ছড়িয়ে পড়তেই নাইক্ষ্যংছড়ি প্রজ্ঞামিত্র ভাবনা কেন্দ্র পরিণত হয়েছে এক তীর্থস্থানে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই লাইন। বেলা গড়ালেও ভিড় কমে না। শত শত, হাজারো মানুষ নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু সবাই এক পথে হাঁটছে। গন্তব্য একটাই: সেই বোধি বৃক্ষ।
সবচেয়ে অবাক করা দৃশ্য এখানেই। এই ভিড়ে শুধু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা নেই। আছেন হিন্দু মা, মুসলিম ভাই, খ্রিস্টান বোন। সবার কপালে একই বিন্দু শ্রদ্ধার।
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পড়ছেন পালি মন্ত্র, পাশেই একজন মা মানতের সুতা বাঁধছেন ছেলের রোগমুক্তির জন্য। একজন যুবক মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করছেন চাকরির জন্য। ধর্ম আলাদা, ভাষা আলাদা কিন্তু চাওয়া একটাই: শান্তি।
একজন স্থানীয় ভিক্ষু আবেগ নিয়ে বলেন, বোধি বৃক্ষ মানে জ্ঞান, মানে করুণা। গৌতম বুদ্ধ যেমন বোধি বৃক্ষের নিচে বসে জগতের দুঃখ দূর করার পথ দেখিয়েছিলেন, এই বৃক্ষও যেন মানুষকে একই বার্তা দিচ্ছে হিংসা ভুলে, ভেদাভেদ ভুলে মানুষ হও।
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর থেকে সোনাইছড়ির পথ সহজ নয়। খাড়া পাহাড়, তবু মানুষের পা থামে না। কেউ হেঁটে, কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ চাঁদের গাড়িতে চেপে—যেভাবে পারছে ছুটে আসছে।
পথের কষ্ট যেন তীর্থের অংশ হয়ে গেছে। অনেকে বলেন, এত কষ্ট করে এসে বৃক্ষের নিচে দাঁড়ালে মনে হয়, জীবনের সব ক্লান্তি ধুয়ে যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, চা-দোকানদার, গাড়িচালক—সবার মুখে হাসি। বোধি বৃক্ষকে ঘিরে নতুন করে প্রাণ ফিরেছে নাইক্ষ্যংছড়িতে। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসন ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ উদ্যোগ নিলে এই স্থান বান্দরবানের ধর্মীয় পর্যটনের এক নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
একজন দর্শনার্থীর চোখে পানি দেখা গেল। তিনি বললেন, জীবনে অনেক জায়গায় গেছি। কিন্তু এখানে এসে মনে হলো, সত্যি-মিথ্যার বিচার বড় না। মানুষের বিশ্বাস, মানুষের শান্তিটাই বড়। এই বৃক্ষ আমাদের সবাইকে এক করে দিয়েছে।
বিজ্ঞান দিয়ে এর সত্যি প্রমাণ হবে কি না, সেটা পরের কথা। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস, মানুষের ভালোবাসা এটাই তো আসল পুণ্য। নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই বোধি বৃক্ষ আজ শুধু একটি গাছ নয়, এটি হয়ে উঠেছে সম্প্রীতি, সহনশীলতা আর মানবতার প্রতীক।